
বিশেষ প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম মহানগরীর বাকলিয়ায় উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বিরোধপূর্ণ পৈতৃক সম্পত্তি জবরদখলের অভিযোগ উঠেছে। এ সময় সীমানাপ্রাচীর ও বাউন্ডারি ওয়াল ভাঙচুর করে জায়গা দখলের চেষ্টায় বাধা দেওয়ায় দুই সহোদর ভাইকে ধারালো ছুরি ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে হামলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত দুই ভাই বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। গত ৩০ অক্টোবর সকাল ৭টার দিকে নগরীর পশ্চিম বাকলিয়া, ডিসি রোডসংলগ্ন ভরা পুকুরপাড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষে আব্দুল জলিল (৬২) বাদী হয়ে বাকলিয়া থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটি ৩৯ নম্বর হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দা মো. হুমায়ুন ফারুক সজীব ও সৈয়দ রুম্মন আজফারসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, বাকলিয়ার ডিসি রোডের ভরা পুকুরপাড় এলাকার আব্দুল কাদেরের বাড়ির অভ্যন্তরে অবস্থিত একটি পৈতৃক জায়গা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। এ বিরোধের জেরে সংঘাত এড়াতে সংশ্লিষ্ট বিরোধপূর্ণ সম্পত্তির বিষয়ে উচ্চ আদালত সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। আদালতের ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের আদেশে ২৯ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত সম্পত্তির দখল ও অবস্থানসংক্রান্ত বিষয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু আদালতের ওই নির্দেশনা উপেক্ষা করেই গত ৩০ অক্টোবর সকাল আনুমানিক ৭টার দিকে বিবাদীপক্ষের লোকজন বেআইনিভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে লাঠিসোঁটা, লোহার রড ও ধারালো কিরিচ নিয়ে বিরোধপূর্ণ জায়গায় প্রবেশ করে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা সীমানাপ্রাচীর ও ভেতরের বাউন্ডারি ওয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। পরে সেখানে টিনের বেড়া স্থাপন করে জায়গাটি জোরপূর্বক নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। এ ঘটনায় বাদীপক্ষের আনুমানিক পাঁচ লাখ টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতিসাধন হয়েছে বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, ঘটনার সময় আব্দুল জলিলের ছেলেরা বিবাদীপক্ষের লোকজনকে আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও স্থিতাবস্থার আদেশের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে সীমানাপ্রাচীর ও দেয়াল ভাঙতে বাধা দেন। এতে আসামিরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। মামলার ১ নম্বর আসামি মো. হুমায়ুন ফারুক সজীবের সরাসরি নির্দেশ ও উসকানিতে অন্য আসামিরা লোহার রড ও লাঠিসোঁটা নিয়ে তাঁদের ওপর এলোপাতাড়ি হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে হত্যার উদ্দেশ্যে ধারালো ছুরি দিয়ে আব্দুল ওয়াহেদ মুন্না (৩৫) ও মঈন উদ্দিন হাসান মিনহাজকে (২৮) লক্ষ্য করে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করা হয়। এতে দুই ভাইয়ের পেটের ডান পাশসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়। তাঁরা রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এ সময় আসামিদের বিরুদ্ধে নারীদের শ্লীলতাহানি এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পরে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় গুরুতর আহত দুই ভাইকে উদ্ধার করে দ্রুত চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তাঁরা সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
পাঁচটি টিন লাগানোর পর ঘটনাস্থলে পুলিশ
ঘটনার সময় পুলিশের উপস্থিতি ও ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে ভুক্তভোগী পরিবার। বাদীপক্ষের অভিযোগ, প্রকাশ্য দিবালোকে যখন বিরোধপূর্ণ জায়গায় ভাঙচুর, জবরদখলের চেষ্টা ও রক্তাক্ত হামলার ঘটনা চলছিল, তখন ঘটনাস্থলে কিংবা আশপাশে পুলিশের কোনো উপস্থিতি ছিল না। এমনকি দুই ভাইকে প্রকাশ্য রাস্তায় ছুরিকাঘাত করে রক্তাক্ত করার সময়ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাউকে দেখা যায়নি বলে তাঁদের দাবি। বিবাদীপক্ষের লোকজন পুরো জায়গাটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পাঁচটি টিন লাগানোর কাজ সম্পন্ন করার পর পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ততক্ষণে দুই ভাইকে রক্তাক্ত জখম করে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নির্বিঘ্নে ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় বলে অভিযোগ করেছেন বাদীপক্ষ। তাঁদের প্রশ্ন, আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও প্রকাশ্যে জমি দখল ও হামলার ঘটনা ঘটলেও তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশি তৎপরতা দেখা যায়নি কেন?
পুলিশের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এদিকে, চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার প্রকৃত সত্যতা যাচাই, এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অগ্রগতি এবং ভুক্তভোগী পরিবারের উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে জানতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বাকলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সৈয়দ আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন এ প্রতিবেদক। তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে বলে জানা গেছে। ভুক্তভোগী পরিবার আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে জায়গা দখলের চেষ্টা, সীমানাপ্রাচীর ভাঙচুর ও দুই ভাইয়ের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার, সুষ্ঠু তদন্ত এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
মন্তব্য করুন