
তাপস চন্দ্র সরকার।।
চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার লামচরী ও বালুচরে সিঁদুর খেলা, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং ধনাগোদা নদীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব-২০২৬। বুধবার (২১ অক্টোবর) দিবাগত মধ্যরাতে ধনাগোদা নদীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনব্যাপী দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটে।
দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে ভক্তদের চোখে ছিল আনন্দাশ্রু, মনে ছিল গভীর আবেগ আর হৃদয়জুড়ে ছিল আগামী বছর আবারও মায়ের আগমনের প্রতীক্ষা। শারদীয় দুর্গোৎসব শুধু পূজা-অর্চনা কিংবা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, সম্প্রীতি ও ভালোবাসার এক অনন্য সম্মিলন। শরতের স্নিগ্ধ আবহে দেবী দুর্গার আগমনকে ঘিরে যে আনন্দের সূচনা হয়েছিল, বিসর্জনের মধ্য দিয়ে তার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও ভক্তদের হৃদয়ে রয়ে গেছে উৎসবের স্মৃতি, প্রার্থনা ও নতুন করে আশায় বুক বাঁধার অনুভূতি।
দুর্গাপূজার শেষ দিনে লামচরী ও বালুচরের পূজামণ্ডপগুলোতে ছিল ভক্তদের উপস্থিতি ও উৎসবমুখর পরিবেশ। বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বী নারীরা অংশ নেন ঐতিহ্যবাহী সিঁদুর খেলায়। লাল সিঁদুরের রঙে রাঙিয়ে ওঠে উৎসবের পরিবেশ। একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে, শুভেচ্ছা বিনিময় করে এবং দেবী দুর্গার কাছে পরিবারের সুখ-শান্তি, সমৃদ্ধি ও মঙ্গল কামনা করে সময় কাটান তাঁরা। সিঁদুর খেলার আনন্দের মাঝেও ছিল বিদায়ের বিষণ্নতা। যে দেবীকে বরণ করে নিতে কয়েক দিন ধরে পূজামণ্ডপগুলোতে ছিল উৎসবের আয়োজন, সেই দেবীকেই বিদায় জানানোর মুহূর্তে অনেক ভক্তের মন ভারী হয়ে ওঠে। আনন্দ আর আবেগের এই মিশ্র অনুভূতিতে মুখর হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপের পরিবেশ।
ভক্তদের কাছে দেবী দুর্গা শুধু প্রতিমায় গড়া একটি রূপ নন; তিনি শক্তি, সাহস, মমতা ও অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক। তাই বিসর্জনের মুহূর্তেও ভক্তদের প্রার্থনা ছিল মায়ের আশীর্বাদে পৃথিবী থেকে দূর হোক অশান্তি, মানুষের জীবনে ফিরে আসুক শান্তি, সুখ ও সমৃদ্ধি। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর বুধবার দিবাগত মধ্যরাতে ধনাগোদা নদীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় লামচরী ও বালুচরের শারদীয় দুর্গোৎসবের আয়োজন। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর এই ঐতিহ্যবাহী মুহূর্তে ভক্তদের মধ্যে বিরাজ করছিল গভীর আবেগ ও ভক্তি। উৎসবের কয়েক দিনের আনন্দঘন মুহূর্তগুলো যেন একে একে স্মৃতির পাতায় জায়গা করে নেয়। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা, তবে ভক্তদের বিশ্বাস ও প্রত্যাশায় দেবী আবারও ফিরে আসবেন আগামী শরতে।
দেবী দুর্গার বিদায়লগ্নে ভক্তদের কণ্ঠে ছিল আগামী বছর আবারও মায়ের আগমনের প্রত্যাশা। তাঁদের প্রার্থনা, দেবী দুর্গার আশীর্বাদে পরিবার, সমাজ ও দেশ সুখে-শান্তিতে বসবাস করুক। মানুষের মধ্যে বিরাজ করুক ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। শারদীয় দুর্গোৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব হলেও এর আবেদন ধর্মীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে সমাজের সর্বস্তরে। পূজাকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে সৌহার্দ্য, পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্প্রীতির বন্ধন। উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে সমাজে মানবিক মূল্যবোধ ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। লামচরী ও বালুচরেও দুর্গোৎসবকে ঘিরে ছিল ধর্মীয় আবহ, উৎসবের আনন্দ এবং ঐতিহ্যের প্রতি গভীর অনুরাগ। পূজার দিনগুলোতে ভক্তদের প্রার্থনা, পূজামণ্ডপের আনুষ্ঠানিকতা এবং বিজয়া দশমীর বিদায়পর্ব—সব মিলিয়ে উৎসবটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য হয়ে ওঠে আনন্দ ও আবেগের এক বিশেষ উপলক্ষ।
দুর্গোৎসবের মূল শিক্ষা হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জয়, অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা। দেবী দুর্গার আরাধনার মধ্য দিয়ে ভক্তরা যেমন আত্মিক প্রশান্তি খুঁজে পান, তেমনি সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিকতার চর্চার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন। বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটলেও এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা ও সম্প্রীতির বার্তা যেন সারা বছর মানুষের জীবনকে আলোকিত করে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয় ভক্তদের।
বিগত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন পূজা উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দ। তাঁরা জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, আনসার বাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। পূজা উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দের মতে, একটি ধর্মীয় উৎসব সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে প্রশাসনের সহযোগিতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং স্থানীয় পর্যায়ে পারস্পরিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সহযোগিতার ফলে উৎসবের আনন্দকে নির্বিঘ্নে উপভোগ করার পরিবেশ তৈরি হয়। তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতেও এ ধরনের সহযোগিতা ও সম্প্রীতির ধারা অব্যাহত থাকবে। সব ধর্মের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্য বজায় রেখে নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারবেন।
দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে পাঁচ দিনের শারদীয় দুর্গোৎসব। পূজামণ্ডপের আলোকসজ্জা, ঢাকের বাদ্য, ভক্তদের প্রার্থনা, সিঁদুর খেলার উচ্ছ্বাস আর বিসর্জনের আবেগঘন মুহূর্ত—সবই এখন স্মৃতি হয়ে থাকবে ভক্তদের হৃদয়ে। তবে এই বিদায়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে নতুন করে ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা। প্রতি বছরের মতো এবারও ভক্তরা দেবী দুর্গার কাছে প্রার্থনা জানিয়েছেন, পৃথিবী থেকে দূর হোক অশান্তি ও হিংসা, প্রতিষ্ঠিত হোক শান্তি ও ন্যায়বিচার। মানুষের মধ্যে তৈরি হোক পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির সেতুবন্ধন। মায়ের বিদায়বেলায় ভক্তদের হৃদয়ে তাই একটাই প্রত্যাশা—আবারও আসবেন মা, আবারও মুখর হবে পূজামণ্ডপ, আবারও ঢাকের তালে তালে আনন্দে মেতে উঠবে চারপাশ। ফিরে আসবে উৎসবের দিন, মিলনমেলায় এক হবে মানুষ। ধনাগোদা নদীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে লামচরী ও বালুচরে শারদীয় দুর্গোৎসব-২০২৬-এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও ভক্তদের হৃদয়ে দেবী দুর্গার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আগামী বছরের প্রতীক্ষা রয়ে গেছে অমলিন। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, আনন্দ-উৎসব ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে শেষ হলো এবারের দুর্গোৎসব—যার রেশ থাকবে স্মৃতিতে, প্রার্থনায় এবং আবারও মাকে বরণ করে নেওয়ার অঙ্গীকারে।
মন্তব্য করুন